আবাসন প্রকল্পের চটকদার বিজ্ঞাপন ও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের কাছ থেকে অন্তত ১,৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘পূর্বাচল বেস্টওয়ে সিটি’র চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ ১৮ বছরেও প্লট কিংবা টাকা ফেরত না পেয়ে সর্বস্বান্ত ভুক্তভোগীরা এখন সুবিচারের আশায় প্রশাসনের দুয়ারে ঘুরছেন।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ভুক্তভোগীরা। ‘পূর্বাচল বেস্টওয়ে সিটি প্লট ওনার্স সোসাইটি’ এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন। এ সময় সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক মঞ্জুর আলম, উপদেষ্টা ফজলুল করিমসহ ক্ষতিগ্রস্ত প্লট মালিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
১৮ বছর ধরে প্রতারণা ও ভয়ভীতি
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ২০০৭ সাল থেকে পূর্বাচল বেস্টওয়ে সিটির নামে প্লট বরাদ্দের কথা বলে কৃষক, প্রবাসী, শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, পেনশনভোগী বয়োবৃদ্ধ ও এতিমদের কাছ থেকে প্লট বাবদ ১,৫০০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ফি বাবদ আরও ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ ১৮ বছর পার হলেও কোনো প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ করা হয়, জমাকৃত টাকা ফেরত বা প্লট হস্তান্তরের দাবি জানালেই ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে উল্টো মিথ্যা মামলা, হামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে এবং চিকিৎসার অভাবে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী মারাও গেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক মঞ্জুর আলম বলেন, “১০ হাজার প্লটের মধ্যে সর্বসাকুল্যে ২০০টি প্লট দেওয়া হয়েছে, যার অনেকগুলোর দলিলেরই সঠিকতা নেই। প্রকল্প এলাকায় রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপ্রতুল, অধিকাংশ জমিই এখন বসবাসের অনুপযোগী।”
উপদেষ্টা ফজলুল করিম অভিযোগ করেন, একাধিক ভুয়া দলিলের মাধ্যমে শেষ বয়সে এসে তাঁর মতো অসংখ্য মানুষের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বিদেশে অর্থ পাচার ও সম্পত্তি তৈরি
ভুক্তভোগীদের দাবি, গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকা দিয়ে প্রকল্পের কোনো উন্নয়ন না করে অভিযুক্ত চক্রটি কুয়াকাটা, কক্সবাজার, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ ও ভালুকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজ ও স্বজনদের নামে শত শত বিঘা জমি কিনেছে। এছাড়া, বিদেশেও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে প্রতারক চক্রের বিচার ও ক্ষতিপূরণের জন্য সরকার ও প্রশাসনের কাছে ৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়:
১. তদন্ত ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: দুদক, সিআইডি ও রাজউকের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে বেস্টওয়ে সিটির সকল ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি তাৎক্ষণিক জব্দ করতে হবে।
২. গ্রেপ্তার ও শাস্তি: চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানসহ জড়িতদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি, দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
৩. ক্ষতিপূরণ ও প্লট হস্তান্তর: প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়ন অথবা ভুক্তভোগীদের সম্পূর্ণ টাকা সুদসহ ফেরত এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৪. ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. আবাসন খাতে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে রাজউকের একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে।
ভুক্তভোগীরা এই ভয়ংকর অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার ঘটনাটি খতিয়ে দেখে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।